কটূক্তির মামলায় নয়, পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় সিফাত কারাগারে, মুক্তির দাবি এমপি সালাউদ্দিনের

সিফাতকে কটূক্তির মামলায় নয়, পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় কারাগারে পাঠানোয় প্রশ্ন উঠেছে; তার মুক্তি ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এমপি সালাউদ্দিন আইউবীসহ কয়েকজন।

শেয়ার
গ্রেপ্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহ
গ্রেপ্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহ | ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহকে একটি পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতে পাঠানো হয়।

সিফাত আব্দুল্লাহর গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী। তিনি জানান, সিফাতের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে সিফাতকে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আপত্তিকর ভাষায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ওই ভিডিওতে তিনি তার বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।

এদিকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার বলেন, সিফাতের বক্তব্যের বিষয়টি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি তার কথাবার্তা ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশের কাছে তথ্য এসেছে। তদন্তে বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল আয়োজন ও সংগঠিত করার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি আরও যাচাই-বাছাই করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আইনগত অভিযোগ থাকলে সেটি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। সিফাতের ক্ষেত্রেও প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই করে প্রকৃত বিষয় উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।

অন্যদিকে সিফাত আব্দুল্লাহর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের এমপি সালাউদ্দিন আইউবী। নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'সরকারকে সমালোচনার দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র সিফাতকে। সে একজন কিশোর। তার সমালোচনার ভাষা বা শব্দচয়ন আপত্তিকর, কিন্তু বিদ্যুৎ নিয়ে তার মনে যে ক্ষোভ, সেটি তো সবারই। একদিকে ভয়াবহ লোডশেডিং, অন্যদিকে ভূতুড়ে বিল। এরপরও ক’জনের মেজাজ ঠিক থাকে!'

এমপি সালাউদ্দিন আইউবী আরও বলেন, 'অবিলম্বে তাকে মুক্তি দিতে হবে। লোডশেডিংসহ জনদুর্ভোগ নিরসন করে জনগণের ক্ষোভ লাগবে-সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।'

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও গাজীপুর-২ আসনের সাবেক ১১ দলীয় জোট মনোনীত এমপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান বলেন, সিফাতের বক্তব্যের ভাষা বা শব্দচয়ন আপত্তিকর হয়ে থাকলে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধে মানহানি বা সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে তাকে একটি পুরনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর বিষয়টি অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।

তিনি বলেন, 'কথাবার্তার জন্য কাউকে আইনের আওতায় আনার প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু একটি তরুণকে পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী?'

আলী নাসের খান আরও বলেন, 'আমরা মনে করি, এ ধরনের পদক্ষেপ পুরনো ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার চর্চার কথাই মনে করিয়ে দেয়। নতুন বাংলাদেশে আমরা এমন কোনো ব্যবস্থা দেখতে চাই না, যেখানে তরুণদের কণ্ঠস্বর বা সমালোচনাকে দমন করার জন্য ভিন্ন মামলার আশ্রয় নেওয়া হবে।'

তিনি বলেন, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকের রয়েছে, তবে একই সঙ্গে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। কোনো তরুণের বক্তব্যে আপত্তিকর শব্দ থাকলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু 'আইনের প্রয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত'- এমনটাই দাবি করেন তিনি।

আলী নাসের খান সিফাতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার স্বচ্ছ তদন্ত এবং তার আইনগত অধিকার নিশ্চিত ও অবিলম্বে সিফাতের মুক্তি দাবি জানিয়ে বলেন, 'তরুণদের ভয় দেখিয়ে নয়, তাদের কথা শুনে এবং জনদুর্ভোগের প্রকৃত কারণ সমাধানের মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে।'

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিফাতের স্থায়ী বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া এলাকায়। বর্তমানে তিনি গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকায় বসবাস করছিলেন। তার পিতার নাম সেকান্দর আলী। তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী।

সিফাতকে ঘিরে পুলিশের পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার যে তথ্যের কথা বলা হয়েছে, সেটি বর্তমানে তদন্তের বিষয়। একই সঙ্গে তার বক্তব্যের ভাষা ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে করা অভিযোগ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। ফলে একজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আইনগত প্রক্রিয়া এবং তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।

স্থান: গাজীপুর