জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকবেন তাঁরা। জনগণের সব দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরবেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ কর্মসূচির পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “সমাধানের জন্যই আমরা রাস্তায় নেমেছি। আপনারা কি সমাধান চান? দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সব দাবি আদায় করে ছাড়ব।” তিনি বলেন, তাঁরা আশাবাদী গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন হবে এবং জুলাই সনদও শতভাগ বাস্তবায়ন হবে।
লংমার্চে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “আপনারা কি গ্যাস পান, বিদ্যুৎ পান, পানি পান? চাঁদাবাজি ছাড়া কি ব্যবসা করতে পারেন? কুমিল্লায় কি দুর্নীতি আছে? আপনারা কি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ দেখতে চান?” জনগণের এসব দাবির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে এবং সব দাবি আদায় করেই তাঁরা ঘরে ফিরবেন বলে জানান তিনি।
লংমার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, “আজকের কর্মসূচি দিয়ে শুরু। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ইনশাআল্লাহ আমাদের লংমার্চ যাবে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে। সেই মহাসমাবেশ কি শুধু চিড়া-মুড়ি খাওয়ার জন্য হবে, নাকি আমাদের দাবি আদায়ের জন্য হবে?” তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “কুমিল্লার লোকেরা আপনারা যাবেন? প্রয়োজনে চিড়া-মুড়ি হাতে নিয়েই যাবেন। দাবি আদায় করে ইনশাআল্লাহ ঘরে ফিরবেন। আপনারা প্রস্তুতি নেন।”
কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের দাবিকে দীর্ঘদিনের দাবি উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেট বিভাগ হওয়ার পর ১৯৯৪ সালে কুমিল্লা বিভাগ করার দাবি উঠেছিল। “কুমিল্লাবাসীর অপরাধ কী?”—প্রশ্ন রেখে তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “কুমিল্লা বিভাগ নিয়ে আর থানায়-পানায় করবেন না, কুমিল্লা বিভাগ দিয়ে দেন। ১৯৯৪ সাল থেকে কুমিল্লাবাসী বিভাগের দাবি করে আসছে। তাই কুমিল্লা নামেই বিভাগ আগে বাস্তবায়ন করতে হবে।”
সাবেক রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের সঙ্গে কুমিল্লার সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “খন্দকার মোশতাকের বাড়ি কুমিল্লা—এ কারণে কুমিল্লার প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব দেখানো হয়ে থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।” কোনো জেলা বা বিভাগের মানুষকে অবহেলা কিংবা অপমান করা হলে সেই অঞ্চলের মানুষ কষ্ট পায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো কি না, তা সাধারণ মানুষই বলতে পারবেন। এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, তিনি সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন, অথচ নিজের মন্ত্রণালয়ের খবর নেই—এমন পরিস্থিতি নিয়ে কী বলা যায়।
দেশে মাদক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বিএনপির সিনিয়র সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দেশে মাদকের জয়জয়কার চলছে এবং এসব মাদক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। নিজের এলাকার মাদকের চালান বন্ধ করতে না পারলেও সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকার সমালোচনা করেন তিনি।
পথসভায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যে দুঃখ-কষ্টে আছে, তা লাঘব করাই তাঁদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য। সরকারকে ‘ওয়েক-আপ কল’ হিসেবে এই আন্দোলনের সূচনা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। দেশের মানুষ নানা দুঃখ-কষ্ট ও সংকটের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের ন্যায্য দাবি পূরণ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় জনগণই তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।
পথসভায় এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের এসব মৌলিক দাবি পূরণ না হলে সরকার গদিতে থাকতে পারবে না। তিনি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নেরও দাবি জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “জনগণের রায় যদি প্রত্যাখ্যান করা হয়, জনগণও সেই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করবে।” জনগণের ভোট ও গণরায়ের প্রতি সম্মান দেখানো রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।
এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় কার্যকর করতে হবে। এই রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত না হলে সরকারকে ব্যর্থ করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক অভিযোগ করে বলেন, জনগণের ভোট ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ক্ষমতায় যাওয়া হয়েছে। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে বিষয়টি মেনে নেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া রায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে সরকারের পরিণতি ফ্যাসিবাদী সরকারগুলোর মতো হবে।
কুমিল্লার পথসভায় সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ। সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মু. মাহবুবর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান সোহেল ও কাউন্সিলর মোশাররফ হোসাইন।
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন আমার বাংলাদেশ পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আব্দুল হালিম ও নুরুল ইসলাম বুলবুল।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মু. আবদুস সাত্তার, কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ জামায়াতের আমির মোহাম্মদ শাহজাহান অ্যাডভোকেট, কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবদুল মতিন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, চাঁদপুর জেলা জামায়াতের আমির মু. বিল্লাল হোসাইন, কুমিল্লা মহানগরী জামায়াতের নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক মামুন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ড. শফিকুল আলম হেলাল, কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. সৈয়দ সরোয়ার উদ্দিন সিদ্দিকী, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম, জাতীয় নাগরিক পার্টি কুমিল্লা মহানগরীর আহ্বায়ক মো. সিরাজুল হক, বাংলাদেশ পার্টি কুমিল্লা জেলা সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ তোফিক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কুমিল্লা মহানগরী সভাপতি মু. সোলাইমান, ছাত্রশিবির কুমিল্লা মহানগরী সভাপতি মু. নাজমুল হাসান পঞ্চায়েত, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন আবির, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা শিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, উত্তর জেলা সভাপতি মু. শাকিল আহম্মদ, এলডিপি কুমিল্লা মহানগরী সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ রাসেল, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কুমিল্লা মহানগরী সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও দক্ষিণ জেলা সভাপতি খাইরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।