উচ্চ শব্দে মাজার শরিফের চাঁদা উত্তোলন, প্রতিবাদ করায় জবি শিক্ষার্থীর ওপর হামলা

উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে মাজারের চাঁদা তোলার প্রতিবাদ করায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়েশা আফরিনের ওপর হামলা ও কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় কুমিল্লার কোতয়ালী মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

শেয়ার
হামলার শিকার ভুক্তভোগী জবি শিক্ষার্থী আয়শা আফরিন
হামলার শিকার ভুক্তভোগী জবি শিক্ষার্থী আয়শা আফরিন | ছবি: সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নৃবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়শা আফরিন। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় নিজ বাড়িতে পরীক্ষা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে সময় উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে মাজার শরিফের নামে চাঁদা উত্তোলন করছিলেন স্থানীয় কয়েকজন।

আয়শা আফরিন মাইকের শব্দ কমানোর অনুরোধ জানিয়ে প্রতিবাদ করায় তার ওপর হামলা ও কুপিয়ে জখম করেন চাঁদা উত্তোলনকারী অভিযুক্ত শাহ আলম ও তার ছেলে অপুসহ আরও কয়েকজন।

হামলার পরও অভিযুক্তরা তার পরিবারকে প্রাণনাশ ও বাড়িঘরে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও তার পরিবার চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন।

রোববার (৫ জুলাই) রাত ৯ টার দিকে হামলার এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আয়শা আফরিন এক ফেসবুক পোস্টে জানান, তার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। এ সময় তাদের বাসার সামনে একটি মাজার শরিফের নামে চাঁদা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানো হচ্ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দ চলতে থাকায় পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। তিনি অত্যন্ত ভদ্রভাবে মাইকের শব্দ কমিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

তবে তার এ অনুরোধে ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করার চেষ্টা করেন। এ সময় শাহ আলম ও তার ছেলে অপুসহ কয়েকজন তার ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, হামলাকারীরা তাকে এলোপাতাড়িভাবে চড়-থাপ্পড় মারে ও মারধর করে। একপর্যায়ে তার কাপড় টানাটানি করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মাথা ও চোখ লক্ষ্য করে কোপ দেওয়া হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।

আয়শা আফরিন বলেন, আমি শুধু শব্দটা একটু কমাতে বলেছিলাম। একটি যৌক্তিক ও সাধারণ অনুরোধের কারণে আমার ওপর যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। মাথা ও চোখ লক্ষ্য করে কোপ দেওয়ার সেই মুহূর্তগুলো এখনো আমাকে আতঙ্কিত করে। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।’

নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন ‘নিজের এলাকায়, নিজের পরিচিত পরিবেশে থেকেও আজ আমি নিরাপদ নই। একজন শিক্ষার্থী ও একজন নারী হিসেবে আমি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

হামলার পরও অভিযুক্তরা থেমে থাকেনি বলে অভিযোগ করেন এই শিক্ষার্থী। তার দাবি, ঘটনার পর হামলাকারীরা তাদের বাসার সামনে এসে প্রকাশ্যে হুমকি দেন। তারা থানায় অভিযোগ বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আরও বড় ক্ষতি করার হুমকি দেন। এমনকি তাদের বাসা ও দোকানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথাও বলে যায়।

ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পর থেকে পুরো পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে আয়শার বাবা-মা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। পরিবারের দাবি, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের তারা শনাক্ত করেছেন এবং তাদের ছবি সংগ্রহ করেছেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

এ ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জকসু তার পাশে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে আফরিন বলেন, ইতোমধ্যেই আমার পরিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জকসুর সাথে যোগাযোগ করেছে। তারা আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দিবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। আমার বন্ধু-বান্ধবদেরও অনেকেই এগিয়ে এসেছে।

এ ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, একটি যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আমরা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পাশে আছি, যেকোন প্রকার আইনি সহায়তা প্রদান করতে আমরা প্রস্তুত। প্রশাসনের নিকট আমাদের অনুরোধ, আপনারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করুন।

ঘটনায় অভিযুক্ত শাহ আলম, অপুসহ সংশ্লিষ্ট অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতয়ালী মডেল থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আয়শা আফরিন।

ভুক্তভোগী ও তার পরিবার দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।