সিন্ডিকেট ও ডিলারদের বিরুদ্ধে সংকট সৃষ্টির অভিযোগ

রাজশাহীতে ভরা আমন মওসুমে সার সংগ্রহ ও দাম নিয়ে বিপাকে কৃষক

রাজশাহীতে চলছে আমন ধান আবাদের ভরা মওসুম। আর এই সময়ে রাসায়নিক সার সংগ্রহ ও দাম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এই সংকট সৃষ্টির জন্য কথিত সিন্ডিকেট ও ডিলারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

শেয়ার

রাজশাহী ব্যুরো

রাজশাহীতে চলছে আমন ধান আবাদের ভরা মওসুম। আর এই সময়ে রাসায়নিক সার সংগ্রহ ও দাম নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এই সংকট সৃষ্টির জন্য কথিত সিন্ডিকেট ও ডিলারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার, অবৈধ খুচরা বিক্রেতা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে সারকেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ কৃষক। সরকারি বরাদ্দ ও সরবরাহ থাকার পরও কৃষককে সরকারের নির্ধারিত দামে সার কিনতে পারছে না। কোথাও ডিলারের দোকানে সার নেই, আবার খুচরা দোকানে চড়া দামে সার মিলছে চাহিদামত। কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই সার বিক্রিতে অনিয়ম চলছে। আগে ডিলাররা বরাদ্দ পাওয়ার আগেই বরাদ্দপত্র কালোবাজারিদের কাছে বিক্রি করতেন। এখন গুদাম থেকে সার তুলে দোকানে নেয়ার আগেই খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার এক জেলার সার অন্য জেলায় কিংবা এক উপজেলার সার অন্য উপজেলায় পাঠিয়ে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ কেজির এক বস্তা সারে স্থানভেদে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষককে। অথচ জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির নিয়মিত সভায় ‘সারের সংকট নেই এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেয়া হচ্ছে না’ বলে জানানো হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরে সরকারি সার কিনতে গিয়ে তাঁরা নানা সমস্যার মুখে পড়ছিলেন। প্রয়োজনের সময় ডিলারের কাছে সার না পেয়ে অনেক কৃষককে অন্য স্থান থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে অবস্থা

রাজশাহীর পবা, মোহনপুর, তানোর ও গোদাগাড়ীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার তথ্য নিয়ে জানা গেছে, মাঠে এখন আমন আবাদের ব্যস্ততা। কোথাও জমি তৈরির কাজ চলছে, কোথাও আগাম জাতের আমন ধানের চারা রোপণ করছেন কৃষক। আগস্টের শেষ পর্যন্ত চলবে এই কর্মতৎপরতা। আর ভালো ফলনের আশায় কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের সার সংগ্রহে ছুটছেন এক দোকান থেকে আরেক দোকানে। সমর্থ কৃষক বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে পারলেও বিপাকে পড়েছেন মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষক। প্রয়োজনীয় এক-দুই বস্তা সার কিনতেও তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সূত্রে জানা যায়, কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার দিতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে ডিলারদের মাধ্যমে সার সরবরাহ করছে। কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপির এক বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। কোথাও আরো বেশি নেয়া হচ্ছে। ডিএপি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায়। আর ১ হাজার ৫০ টাকা দামের এমওপির বস্তাতেও নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ টাকা। পবা উপজেলার একজন কৃষক জানান, ‘ডিলারের কাছে গেলে মওজুদ শেষ বলে জানানো হয়। অথচ খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গেলে যতো সার লাগে দিতে চায়। তবে দাম বেশি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত বরাদ্দ তালিকা অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্ট মাসে রাজশাহী অঞ্চলের জেলাগুলোতে ইউরিয়া সারের বাইরে অন্য সারগুলোর বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কৃষকদের প্রশ্ন, বরাদ্দ বাড়ানোর পরও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না কেন। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করছেন ‘সার সংকটের কোনো খবর তাদের জানা নেই।’ আর বিএডিসির কর্মকর্তাদের দাবি, ‘কৃষকরা জমিতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করায় চাহিদা বেশি থাকছে এবং দ্রুত মওজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ কৃষকদের অভিযোগ, ‘সার বিতরণ ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর তদারকি নেই।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক দাবি করেন, মাঠ পর্যায়ের কিছু কৃষি কর্মকর্তা ও অসাধু ডিলারের যোগসাজশে সার নিয়ে অনিয়ম চলছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার অবৈধ খুচরা সার বিক্রেতারাও জড়িত। কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও যদি ডিলারের দোকানে সার না মেলে, অথচ অবৈধ খুচরা দোকানে বেশি দামে সার পাওয়া যায়, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে- তা খুঁজে বের করা হচ্ছে না। জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, “সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কৃষক তথ্য দিলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে।”

পাচার ঠেকাতে অভিযান

কৃষকের জন্য সরকারি বরাদ্দের সার নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে সরিয়ে নেয়ার অভিযোগে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান বাজারে অভিযান চালিয়ে ১২ বস্তা রাসায়নিক সার জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ঘটনায় মেসার্স সাইদুর ট্রেডার্সের মালিককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গত শুক্রবার হরিয়ান বাজারে ওই প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬-এর ১২ ধারায় তাদেরকে এ অর্থদ- দেয়া হয়। এখানকার একজন রাজনৈতিক নেতা বলেন, কৃষকের জন্য বরাদ্দ সরকারি সার অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার অভিযোগের বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। সরকারি সার নির্ধারিত পথে না গেলে মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। তিনি ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, সরকারি সার বিতরণে অনিয়ম হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা। তাঁদের অনেকেরই বেশি দামে সার কেনার সামর্থ্য নেই। তাই সরকারি বরাদ্দের সার কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী যথাসময়ে বিতরণ এবং ডিলারদের মওজুদ ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত তদারকির দাবি জানান তাঁরা।