মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে

তেল-গ্যাস আমদানিতে ৬ মাসে গচ্ছা ৩৬,৪০০ কোটি টাকা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির ফলে গত আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

শেয়ার
  • ৬২ কার্গো এলএনজি বিল ৩০০ কোটি ডলার
  • জ্বালানি তেলের বিল ২২ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির ফলে গত আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) লোকসান দিয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর একই কারণে বাড়তি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানি করে গত ৬ মাসে পেট্রোবাংলা লোকসান দিয়েছে ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু তেল এবং গ্যাস খাতে লোকসান হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাস ধরলে এই লোকসান আরও বাড়বে।

অপরদিকে বাড়তি দামে কয়লা এবং ফার্নেস অয়েল কিনতে গিয়ে অনেকটা দেউলিয়া হওয়ার দশা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। বিদ্যুৎ বিভাগের এই সংস্থা জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ধরা হয়েছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেই লোকসান গিয়ে ঠেকবে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বাংলাদেশকে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে। সরকারের কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে সংকট নিরসনে সরকার সাধ্যমতো সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ সামনের দিকে বেগবান না হলে দু’সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারে।

এদিকে গত এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ উত্তপ্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও হুহু করে বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ব্র্যান্ড ক্রুডের দাম ৯৬ দশমিক ৬৩ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হলে এই দাম আরও বাড়বে। এর মানে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সামনে আরও বিপদ হাতছানি দিচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে দেশের জনগণ এবং সরকারকে সাশ্রয়ী হতে হবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লেও আগামী কয়েক মাস বেশি দামে তেল এবং এলএনজি কিনে শিল্প কারখানা চালু রাখতে হবে। তবে শীতকালে কিছুটা লোডশেডিং দিয়ে সেই অর্থ সাশ্রয় করতে পারে সরকার। এ বিষয়ে জনগণের সহায়তা দরকার।

আর্থিক ক্ষতি এলএনজিতে :

স্পট, স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় চলতি মাসে সরকার ৯ কার্গো এলএনজি কিনছে। এর মধ্যে প্রতি ইউনিট ২৭ ডলারের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। এর আগে সরকার এই এলএনজি ১০/১১ ডলারে কিনেছে।

জ্বালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৬২ কার্গো এলএনজি কিনে বাংলাদেশকে বিল দিতে হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে ৮ কার্গো এলএনজি কিনে বাংলাদেশ বিল দিয়েছে ২১ কোটি ৮৭ লাখ ৮৮ হাজার ৩২ ডলার। যুদ্ধের পরের মাসে ৯ কার্গো এলএনজি কিনে বিল দিয়েছে ৩৫ কোটি ছয় লাখ ৮১ হাজার ৮৬৪ ডলার।

এপ্রিলে কাতার, ওমান এবং এক্সিলারেট দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্থগিত (ফোরস মেজার) করে। এরপর এলএনজি কিনতে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এপ্রিলে বাংলাদেশ ৯ কার্গো এলএনজি আমদানি করে। এর মধ্যে ৮টি হচ্ছে স্পট মাকের্ট থেকে। এ কারণে এপ্রিল মাসে এই আমদানি বিল গিয়ে ঠেকে ৬০ কোটি ছয় লাখ ৬১ হাজার ৪১৭ ডলার।

মে মাসে ১০ কার্গো এলএনজির মধ্যে স্পট থেকে আমদানি করা হয়েছে ৮ কার্গো। এই মাসে এলএনজি বিল দিতে হয়েছে ৫৪ কোটি ৭১ লাখ ৩১ হাজার ৭০৬ কোটি ডলার। তবে জুলাই মাসে যুদ্ধের দামামা কমার কারণে এলএনজি আমদানির বিল কিছুটা কমেছে।

এই সময়ে ৯ কার্গো এলএনজির জন্য বিল দিতে হয়েছে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ ১১ হাজার ৫৭৫ ডলার। চলতি মাস সেপ্টেম্বরে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। তাই এই এক মাসে পেট্রোবাংলাকে লোকসান দিতে হবে ছয় হাজার কাটি টাকা।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধের আগে এক কার্গো এলএনজি আনতে খরচ হতো ৪০০-৫০০ কোটি টাকা। এখন সেই বিল গিয়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি। এই হিসাবে যুদ্ধের কারণে গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত পেট্রোবাংলার লোকসান ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর বাইরে সেপ্টেম্বরে (ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন অনুযায়ী) ৯ কার্গো এলএনজি কিনে লোকসান দিতে হবে আরও ছয় হাজার কোটি টাকা। তবে লোকসানের বেশির ভাগ টাকা সরকার ভর্তুকি আকারে পেট্রোবাংলাকে দিয়ে দিচ্ছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, এখন আমদানি এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের (মিশ্রিত) দাম পড়ছে প্রতি ইউনিট ৪৫ টাকা। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। পেট্রোবাংলা এই গ্যাস বিক্রি করছে ২৩ দশমিক ৯০ টাকা।

জ্বালানি তেল আমদানিতে বড় ক্ষতি:

বিপিসি গত ছয় মাসে সরকারকে চারটি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। যুদ্ধ না থামলে বাংলাদেশের সামনে আরও বড় বিপদ। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরের মাস থেকে লোকসানের হিসাব বাড়তে থাকে।

বিপিসি জানিয়েছে, বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে চলতি বছরের মার্চে দুই হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ, এপ্রিলে সাত হাজার ৮৬৬ কোটি তিন লাখ, মে মাসে দুই হাজার ৬২১ কোটি ২৮ লাখ, জুনে ছয় হাজার ১৯৮ কোটি ৫৮ লাখ এবং জুলাইয়ে এক হাজার ১২৫ কোটি ৪৭ লাখ, অর্থাৎ পাঁচ মাসে লোকসান দিতে হয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর বাইরে আগস্ট মাসে আরও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে বিপিসিকে। ফলে গেলো ৬ মাসে মোট ২২ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বাড়তি বিল দিতে হয়েছে।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েল, এএলসি, মারবান এবং এলপিজি কিনতে হবে ছয় লাখ ৬৫ হাজার টন। এজন্য ব্যয় হতে পারে আট হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। অক্টোবরে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে লাগবে আট হাজার ৭৭৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং নভেম্বরে সাত লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি কিনতে লাগবে ১১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার বেশি। এই তিন মাসে জ্বালানি পণ্যের বিল দিতে হবে ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।