শিল্প উৎপাদন হ্রাস ভালো লক্ষণ নয়

পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাসের যোগান না পাওয়ার কারণে দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এতে অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আগামীতে অর্ডার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেয়ার

পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাসের যোগান না পাওয়ার কারণে দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এতে অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আগামীতে অর্ডার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি সত্যি তেমনটি ঘটে তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি’র (বিজিএমইএ) নেতৃবৃন্দ সম্প্রতি বঙ্গভবনে নব নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তাদের এ শঙ্কার কথা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। তারা বলেন, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সমস্যা সমাধান করা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাত বিপর্যয়ের মুখে এসে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, তৈরি পোশাক বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের মতো আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশটি বাংলাদেশকে অতিক্রম করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসবে এতে কোন সন্দেহ নেই। ভিয়েতনামের দক্ষ শ্রমিক ও বিদ্যুৎ,গ্যাসসহ আবশ্যিক উৎপাদন উপকরণ যোগানদানের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারি খাত তৈরি পোশাক শিল্প আমদানিকৃত কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও মধ্যবর্তী নির্ভর বলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ১৭টি দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকদের তুলনায় অনেক বেশি। এসব কারণে ভিয়েতনাম আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল ঠিক তখনই ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। এ যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদেশি ক্রেতারা তাদের অর্ডার প্রত্যাহার করতে থাকে। অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার আগেই অভ্যন্তরীণভাবে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ কমে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানির অভাবে তৈরি পোশাক শিল্পগুলো ঠিক মতো তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। কোন কোন কারখানায় উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। ফলে কারখানাগুলো বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা মতো তৈরি পোশাক সরবরাহ করতে পারছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প চরম বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়াতে পারে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পই নয় অন্যান্য শিল্পকারখানার অবস্থাও একই রকম। তারা তাদের স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।

গ্যাস হচ্ছে বিদ্যুতের প্রাথমিক জ্বালানি। বর্তমান গ্যাস সঙ্কটের কারণে দেশে বিদ্যুত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন ব্যাপক মাত্রায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অনেক দিন ধরেই জ্বালানি বিশেষজ্ঞগণ নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য তাগিদ দিয়ে এলেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। বর্তমানে দেশে মোট ২৯টি এর মধ্যে উৎপাদনে আছে ২০টি গ্যাস ক্ষেত্র। উৎপাদনে থাকা এসব গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ২হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। তবে উত্তোলন করা হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশে মোট ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে। প্রকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। সঠিকভাবে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা করা গেলে বাংলাদেশ গ্যাস সম্পদে স্বনির্ভর হতে পারবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৫টি গ্যাস ক্ষেত্র খণন করে একটিতে গ্যাস পেলে তাকে সন্তোষজনক বলে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে প্রতি তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র খণন করে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হবার ফলে সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখনো সমুদ্রবক্ষে জ্বালানি অনুসন্ধান শুরু করা সম্ভব হয়নি। অথচ ভারত ও মিয়ানমার তাদের চিহ্নিত সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে অনেকগুলো গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। বাংলাদেশের এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার মাঝে অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে বিদেশি থেকে এলএনজি আমদানির প্রতি বেশি আগ্রহ প্রত্যক্ষ করা যায়।

সঙ্কট সমাধানের জন্য স্বল্প মেয়াদে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস আমদানি করা যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পিতভাবে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে হবে।