পাঁচ ঝুঁকিতে ব্যাংকিং খাত

দেশের ব্যাংকিং খাত আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার সমস্যা সৃষ্টি করে গেছে এবং হাজার কোটি কোটি বিদেশে পাচার করেছে তারা এবং তাদের অলিগার্করা। অন্তর্বর্তী সরকার সে অবস্থা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা চালায়। তবে নির্বাচনের পর এখন গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এসে সংকট নতুন মাত্রায় দেখা দিচ্ছে।

শেয়ার

দেশের ব্যাংকিং খাত আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার সমস্যা সৃষ্টি করে গেছে এবং হাজার কোটি কোটি বিদেশে পাচার করেছে তারা এবং তাদের অলিগার্করা। অন্তর্বর্তী সরকার সে অবস্থা থেকে টেনে তোলার চেষ্টা চালায়। তবে নির্বাচনের পর এখন গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এসে সংকট নতুন মাত্রায় দেখা দিচ্ছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত পাঁচ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) মাইনাস (-) ২.৬৪ শতাংশ, খেলাপি ঋণ (এনপিএল) প্রায় ৩০ শতাংশ, সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) মাইনাস (-) ৪.৮১ শতাংশ এবং ইক্যুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) মাইনাস (-) ২৪৩.৯ শতাংশ, এর পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের অনুপাত ৯১ শতাংশ।’ অর্থমন্ত্রণালয় থেকে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সূচকগুলো তীব্র ব্যালেন্স শিট চাপ, দুর্বল মুনাফা এবং সীমিত পরিচালন দক্ষতা নির্দেশ করে, যার ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো অভিঘাত সহ্য করার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। যদিও সামগ্রিক স্তরে লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও ১০০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। যা একটি সামগ্রিক পর্যাপ্ত তারল্য পরিস্থিতি নির্দেশ করে। অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি অণুবিভাগ প্রণীত ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি-২০২৬-২৭ হতে ২০২৮-২০২৯’ এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলেছে, দেশের ব্যাংকিং খাত আর্থিক ঝুঁকির একটি উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে রয়ে গেছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু অংশের সম্পদের গুণগত মান, মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের গুরুতর দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করে।’ ব্যাংকিং খাতে এ খারাপ অবস্থা দেশের অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব রাখছে তা বিশ্লেষণ করেছে অর্থ বিভাগসংশ্লিষ্ট উইং। তারা বলছে, ‘দুর্বলতাগুলো (ব্যাংকিং খাতের) আর্থিক মধ্যস্থতাকে বাধাগ্রস্ত করে, মুদ্রানীতির সঞ্চালনকে দুর্বল করে এবং সরকারি খাতের আকস্মিক সহায়তার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়ে বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল মূলধন ভিত্তি, ক্রমাগত লোকসান এবং অসম তারল্য পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকগুলো সাধারণত নতুন ঋণ প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করে, উচ্চ ঋণ মার্জিন বা স্প্রেড বজায় রাখে এবং উৎপাদনশীল খাতগুলোতে ঋণের প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

বলা হয়েছে বর্তমান সরকার এ ভঙ্গুর ব্যাংকব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আর্থিকখাতের যে বাস্তব অবস্থা স্পুষ্ট হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রভাবনির্ভর ও বেনামি ঋণ প্রদান, অস্বচ্ছতা, পুনঃতফসিলকরণ সুবিধার অপব্যবহার এবং বিধি-বিধানের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করে প্রবণতা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। ২০০৫ সালে ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩.৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বেড়ে ৩৫.৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর পরিণতিতে অনেক ব্যাংকে তারল্যসংকট দেখা দিয়েছে, আমানতকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং কিছু কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন অথবা একীভূতকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।’

আশার কথা এ ঝুঁকি মোকাবেলায় কী করা উচিত- তার কথা বলেছে অর্থ বিভাগ। তাদের বক্তব্য, এ ঝুঁকিগুলো মোকাবেলার জন্য তদারকিব্যবস্থা ধারাবাহিক জোরদারকরণ, খেলাপি বা সংকটাপন্ন সম্পদের দ্রুত নিষ্পত্তি, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃমূলধনকরণ ও পুনর্গঠন এবং পুরো ব্যাংকিং খাতজুড়ে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় দক্ষতার উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।

আমরা মনে করি তাদের এ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। দেশের অর্থনীতির এই ঝুঁকি দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। এ থেকে পরিত্রাণ লাভের ব্যাপারে যা যা করণীয় তা করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়া জরুরি।