রাতে বান্দরবান শহরের সৌন্দর্যে অবগাহন

রাতের বেলায় বান্দরবান শহরে ঘুরাফেরা করা একদিকে আতঙ্কের অন্যদিকে উত্তেজনার। এক সময় রাতের বেলায় বান্দরবান শহরে বের হওয়ার চিন্তা করা যেত না। সময়ের পরিবর্তনে এখন গভীর রাত পর্যন্ত ঘরাফেরা করা যায় বান্দরবানের রাস্তায়।

শেয়ার

রাতের বেলায় বান্দরবান শহরে ঘুরাফেরা করা একদিকে আতঙ্কের অন্যদিকে উত্তেজনার। এক সময় রাতের বেলায় বান্দরবান শহরে বের হওয়ার চিন্তা করা যেত না। সময়ের পরিবর্তনে এখন গভীর রাত পর্যন্ত ঘরাফেরা করা যায় বান্দরবানের রাস্তায়। তবে বিগত দিনের আলোচনা চলে মুখে মুখে। সারাদিন পাহাড়ি সৌন্দর্য্য অবগাহন করে ঘুরে ফিরে সন্ধ্যায় অনেকেই শহর দেখার জন্য বের হন। বিশেষ করে বার্মিজ মার্কেটে যান কিছু কেনাকাটা করতে। আমাদের তিনদিনের বান্দরবান সফরের দ্বিতীয় দিন ১৪ জানুয়ারি রাতের খাবার গ্রহণের পর ৮টার দিকে বাসসের রানা ভাইকে সাথে নিয়ে বের হই বার্মিজ মার্কেটের উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য পাহাড়ি ফলের স্বাদ গ্রহণ করা। শহরের মূল রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই মন্তব্য করতে থাকেন যে, কিছুদিন আগেও রাতের বেলা এই শহরে এভাবে বের হওয়া কঠিন ছিল। আজ অনেকটাই নিরাপদে হাঁটছি। মনে হচ্ছে দুই পাশের হাজারো পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কোথাও পাহাড়ের খাঁজে উপজাতিদের বসবাস করা পাড়া। আবার কোথাও নিকষ কালো অন্ধকার জঙ্গলে ঢাকা।

রাত ১০টার দিকে বান্দবান শহরের বার্মা মার্কেটের সামনে বাংলাদেশ সংবাদসংস্থা বাসসের বান্দরবান সংবাদদাতা সৈকত দাসের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমাদের অনেককেই বার্মা বাজারে আশপাশে ঘুরাঘুরি করছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই পরিবারের সদস্যদের জন্য পাহাড়িদের তৈরি পোশাক কেনাকাটা করা। ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেল বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম ভাইকেও। বার্মিজ মার্কেট থেকে অনেকেই কিনলেন পরিবারের সদস্যদের জন্য। কিছুটা সস্তায় কিনতে পেরে অনেককে চওড়া হাসি দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেলে সামনে দিয়ে। আড্ডায় আমার সঙ্গে ছিলেন বাসসের সিনিয়র রিপোর্টার রানা ভাই। কথায় কথায় আমি সৈকত দা’র কাছে পাহাড়ের জীবনযাপন থেকে শুরু করে নানান কিছু জানতে চাচ্ছিলাম। অকপটে উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি নানা বিষয় জানাতে লাগলেন আমাদের। সৈকত দা যোগ করেন এক দুই দিনে পাহাড় সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারবেন না। এক সপ্তাহ সময় নিয়ে আসেন, তাহলে বান্দরবানের কিছুটা উদ্ধার করতে পারবেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে সৈকত দা আমাদের প্রস্তাব করে বললেন, চলেন দাদা অল্প সময়ের মধ্যে আপনাদের এককাপ চা খাওয়াবো এবং একটা জিনিস দেখাবো। বিশেষ স্বাদের চা। রাতের অন্ধকারে রানা ভাই কিছুটা আমতা আমতা করলেও আমি একবাক্যে রাজি হই। কারণ ঘুরাফেরা করার ব্যাপারে আমি একটু বেশি আগ্রহী। সৈকত দার মোটর সাইকেলের পেছনে আমি আর রানা ভাই উঠে পড়লাম। রাতের বেলা বান্দরবানে বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। কিন্তু বেড়ানোর জন্য এই ঠাণ্ডাকে তোয়াক্কা করলাম না। মোটর সাইকেল শহরের মাঝদিয়ে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর উপর নির্মিত ব্রীজ পার হয়ে নতুন এলাকায় চলতে থাকলো। আন্দাজ করলাম তিন চার কিলোমিটার পর একটা ব্রীজ পার হলো। জানালেন এই এলাকার নাম পুলপাড়া। ব্রীজকে স্থানীয় ভাষায় পুল বলা হয়। আর এ কারণ এলাকার নাম পুলপাড়া। ব্রীজ পার হয়ে মোটরসাইকেল থামলো। উপরের দিকে পাহাড়ের দিকে তাকাতেই চোখে ভাসলো এক বিরাট মন্দির। রাতের অন্ধকারেও আমি আর রানা ভাই এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম স্বর্ণ মন্দিরের দিকে। আলো ঝলমলে রঙে চারদিক আলোকিত। সৈকত দা আমাদের বললেন এটাই বান্দরবানের বিখ্যাত স্বর্ণ মন্দির। সুউচ্চ, পাহাড়ের চূড়ার তৈরি সুদৃশ্য প্যাগোডা। এটি বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক বৌদ্ধ ধর্মালম্বী দেখতে এবং প্রার্থনা করতে আসেন। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মন্দির এই বৌদ্ধ ধাতু জাদী।

তিনি আরও জানালেন, গৌতমবুদ্ধের সমসাময়িককালে নির্মিত বিশ্বের সেরা কয়েকটি বুদ্ধ মুর্তির একটি এখানে রয়েছে। প্রায় ১০এই প্যাগোডাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেরাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে স্বর্ণমন্দির উপাসনালয়টি পরিগনিত হচ্ছে বান্দরবান জেলার একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসাবে। এই প্যাগোডা একটি আধুনিক ধর্মীয় স্থাপত্যের নিদর্শন। এটির তৈরিতে মায়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর নির্মাণশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে।

রাত বেশি হয়ে গেছে মন্দিরে প্রবেশ করা গেলো না।দূর থেকেই দেখতে হলো স্বর্ণমন্দিরের রূপ রং। তবে আশপাশ থেকে মন্দির দেখার চেষ্টা করলাম। বড় একটি টিলার মাথাজুড়ে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত চোখধাঁধানো এক মন্দিরের নাম স্বর্ণ মন্দির। সোনালি কালারের ব্যবহারে এই মন্দির আলো ছাড়াই ঝলমল করে দিন রাত। রাতেও এ মন্দির সোনালী রংয়ের এক অপূর্ব নির্মাণ শৈলী ও আধুনিক ধর্মীয় স্থাপত্য নকশার নিদর্শনস্বরুপ এ স্থানটি কাছে সবার খুবই আকর্ষনীয়। সোনালি এই মন্দিরটি বৌদ্ধ ধাতু জাদী নামে পরিচিত। আমাদের হাতে সময় স্বল্প। কিন্তু তাতে কি। বান্দরবান শহরে আছি অথচ বিখ্যাত স্বর্ণ মন্দির স্বচোখে দেখবো না তা কি করে হয়।

গেইটের সামনে যাওয়ার সাথে সাথেই দোকানি খাঁটি গরুর দুধের তৈরি দই খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যেও আমি খাঁটি দইয়ের অফার মিস করলাম না। বললাম দাদা দেন। আমার দেখাদেখি রানা ভাইও খাঁটি দইয়ের স্বাদ পরখ করলেন। এরপর আমাদের সামনে এলো সৈকত দার অফার করা স্পেশাল চা।

চা মুখে দিয়ে দেখি ভিন্ন রকমের স্বাদ। চায়ে আবিস্কার করলাম চাল ভাজার গন্ধ। জিজ্ঞেস করি কি ব্যাপার চাচা চায়ে চালভাজা দিলেন না-কি। দোকানি মাথা নেড়ে বললেন, চালভাজাসহ আরও ১২টা উপাদান রয়েছে এই চায়ে। মনে মনে ভাবলাম কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও ৪ কিলোমিটার দুরে আসাটা সার্থক হয়েছে। দ্রুতই রাত গভীর হচ্ছে। তাই হোটেলে ফিরার তাড়া অনুভব করলাম। সৈকত দাকে বললাম চলেন আজ যাওয়া যাক। আবার আসতে হবে’ দিনের বেলায়। এতোদিন কানে শুনেছি এই স্বর্ণ মন্দিরের কথা। আজ রাতে হলেও চামড়ার চোখে দেখে গেলাম।