টানা ৫৩ মাস (সাড়ে চার বছর) ধরে বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করে টানা ৫৩ মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। ফলে সাধারণ মানুষ যে হারে আয় বাড়াচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ।
আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান:
প্রতি মাসে যে হারে মূল্যস্ফীতি বা পণ্যমূল্য বাড়ছে, সাধারণ কর্মজীবী বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের বেতন বা মজুরি সেই হারে বাড়ছে না। ফলে কাগজে-কলমে মজুরি সামান্য বাড়লেও বাজারের বাড়তি খরচের কাছে তা মার খাচ্ছে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের ওপর প্রভাব:
দীর্ঘ সময় ধরে ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকায় সীমিত আয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছে। খরচ সামাল দিতে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙছেন, ঋণের ওপর নির্ভর করছেন কিংবা দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অনানুষ্ঠানিক খাতের সংকট:
বিবিএস-এর তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রায় ৫ কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কোনো স্থায়ী বেতন কাঠামো বা সামাজিক সুরক্ষা না থাকায় তারা এই দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণসমূহ
মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান: বিবিএস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮.১৮ শতাংশ। আয় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয়ের গতি বেশি হওয়ায় মানুষের পকেটের টাকা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি: সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফায় জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহন খরচ এবং উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার ও খাদ্যপণ্যের ওপর।অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর প্রভাব: দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৮৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে (যেমন- কৃষি, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পরিবহন) হয়ে থাকে, যেখানে ৫ কোটিরও বেশি মানুষ নিয়োজিত। এই খাতের শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় তারা সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
ব্যবসায়িক মন্দা: লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের কেনাকাটার সামর্থ্য কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশের ১৭টি খাতের কর্পোরেট মুনাফা প্রায় ৪৪ শতাংশ কমে গেছে।
সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি:
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মে মাসের ৯.৪২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে চলতি বছরের জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.১৬ শতাংশে। তবে এই সামান্য হ্রাস দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বা সুদের হার বাড়িয়ে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। বাজার কারসাজি রোধ, কঠোর মজুরি নীতি, এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।