ঈদের আগে ও পরে ১৪ দিনের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ

ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের চরম ভোগান্তির আশঙ্কা

আগামী ঈদুল আজহায় ঈদ যাত্রায় চরম ভোগান্তি শিকার হতে পারে ঘরমুখো মানুষ। মহাসড়কগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যানজট, পথে পথে কুরবানির পশুর গাড়িতে চাঁদাবাজি এবং ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী পশুর হাট বসার শংকা থেকে এমন দুর্ভোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ার
  • যানজটের সম্ভাব্য ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত
  • পথে পথে গরুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির আশঙ্কা
  • শেষ সময়ে মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী হাট বসার পাঁয়তারা

আগামী ঈদুল আজহায় ঈদ যাত্রায় চরম ভোগান্তি শিকার হতে পারে ঘরমুখো মানুষ। মহাসড়কগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যানজট, পথে পথে কুরবানির পশুর গাড়িতে চাঁদাবাজি এবং ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী পশুর হাট বসার শংকা থেকে এমন দুর্ভোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ ঈদ যাত্রার আয়োজনের কথা বলা হচ্ছে।

জানা গেছে, ঈদুল আজহা সামনে রেখে সারা দেশে যানজটের সম্ভাব্য ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ঈদের আগে ও পরে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে এসব এলাকায় বিশেষ নজরদারি ও মনিটরিং করা হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে সভার কার্যপত্রে এই তথ্য উঠে এসেছে।

যানজটের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ৭টি, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৭টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৮টি এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ১টি।

সড়ক বিভাগ বলছে, ঈদযাত্রায় গাজীপুর, আবদুল্লাহপুর, বাইপাইল ও চন্দ্রা এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এসব এলাকায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, অস্থায়ী কাউন্টার ও অনিয়মিত পরিবহন নিয়ন্ত্রণে এবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

সূত্র জানায়, এবার বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও ঈদযাত্রার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বৃষ্টি হলে যানজট বাড়ে, পুলিশের তৎপরতা ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে কুরবানির পশু পরিবহনের বাড়তি চাপ।

সূত্র জানায়, গত ঈদে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছিল পোশাক খাতের (গার্মেন্টস) শ্রমিকদের একই দিনে বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে। বিজিএমইএর সঙ্গে তিন ধাপে ছুটি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা যায়নি। ফলে গাজীপুর ও এর আশপাশের এলাকায় এক দিনেই ১০-১৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ার চেষ্টা করে। অনেক যাত্রী বাস কাউন্টারে না গিয়ে সরাসরি সড়কে নেমে যানবাহনে ওঠার চেষ্টা করায় তীব্র যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এবারও ধাপে ধাপে ছুটি দিতে বলা হয়েছে।

সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মহাসড়কের পাশে বা ওপরে কোথাও পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবার ফেরিতে বাস ওঠানোর ক্ষেত্রে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে ফেরিতে ওঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ফেরিতে ওঠার আগে ব্যারিকেড বসানো হচ্ছে, যাতে ফেরি পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত কোনো যানবাহন এগোতে না পারে। ফেরির পন্টুনেও অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে চলছি।’

তিনি বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০-৩১ মে পর্যন্ত বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু থাকবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যানজট নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে বিশেষ মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। এ জন্য ১৯ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি আরও ৫০ জন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঈদের আগে ও পরে গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজা ও যানজটপ্রবণ এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হবে। বিআরটিসি বিশেষ ঈদ সার্ভিস চালাবে এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত বাস প্রস্তুত রাখা হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাপ্রবণ মহাসড়কে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও চালকদের ডোপ টেস্ট করা হবে।

এদিকে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুরবানির পশুবাহী কোনো যানবাহনে চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সড়ক পরিবহন, নৌ ও রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, পশুবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ নেই এবং এ ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত কঠোর। চাঁদাবাজির কোনো তথ্য পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

মন্ত্রী জানান, কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সড়কে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে আসন্ন ঈদুল আজহায় ঘরমুখী মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা আদায় না করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। দেশের সব জেলা শাখা বা ইউনিটে এই নির্দেশনা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি। সংগঠনের মহাসচিব মো. সাইফুল আলম জানিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি জানায়, দেশের সব ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাংকলরির সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করতে একটি সাব-কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই কমিটি যানজট ও দুর্ঘটনা নিরসনসহ সংশ্লিষ্ট সব সমস্যা চিহ্নিত করবে এবং কেন্দ্রীয় কমিটির মাধ্যমে তা সমাধানের উদ্যোগ নেবে।

এদিকে ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারাদেশে ঈদের সাত দিন আগে ও সাত দিন পরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ করা, পশুর হাট ব্যবস্থাপনা, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, কুরবানির পশুর হাটের নিরাপত্তা এবং সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ক সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঈদের আগের সাত দিন এবং পরের সাত দিন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল চালু থাকবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার হটলাইন নম্বর সক্রিয় রাখা হবে। পুলিশ, র‌্যাব , আনসার-ভিডিপি, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, জেলা প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের কুরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৫টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১১টি পশুর হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য মহানগর ও জেলা পর্যায়ে হাজারো হাট নির্ধারণ করা হয়েছে। হাটগুলোতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ বসানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সক্রিয় থাকতে বলা হয়েছে।

কুরবানির পশুবাহী ট্রাক ও নৌযানে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে এবং সিভিল ড্রেসে গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। কোথাও চাঁদাবাজির তথ্য পাওয়া গেলে হটলাইনে জানালেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, গত ৩০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে।

সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা কমাতে স্পিডগান ব্যবহার, রেকার প্রস্তুত রাখা এবং মহাসড়কের গর্ত দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফেরি ও লঞ্চে পশু পরিবহনেও নজরদারি বাড়ানো হবে। ফায়ার সার্ভিসের জরুরি নম্বর ১০২ সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে বলেও জানান তিনি।